সম্ভাবনার নতুন দুয়ার; আল হেরা পাঠাগার ।। জাহিদ আল হাসান
হাওড়ে হয়ে গেলো ২য় বই পড়া উৎসব
পাঠাগার মানেই জ্ঞানের পরিধি বিকশিত করার উৎস। আত্মমর্যাদা প্রকাশ ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশে পাঠাগারেরর বিকল্প নেই। অধিক বই পড়া ও চর্চা ব্যতিত মানুষের মানবীয় গুনাবলী সম্পূর্ন চারিত্রিক চাল-চলনে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। পারিবারিক, সামাজিক বিভিন্ন ধরণের কাজ কর্মের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি একটু সময় পাঠাগারের জন্য ব্যয় করে তাতেই পেতে পারে মনের সজীবতা। জানতে পারে ভবিষ্যত জীবনের পথ চলার সন্ধান। সেই সন্ধানী পথ উজ্জল করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে আল-হেরা পাঠাগার।
ভাটি বাংলার রাজধানী নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিনের একটা ছোট্ট গ্রাম রাম জীবনপুর। ধলাই নদীর তীর ঘেষে বেড়ে উঠা এই গ্রামের মানুষ সাধারণত কৃষক। এই কৃষকেরা সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে তুলেছেন একটি পাঠাগার। জনমুখী সাধারণ পাঠাগার। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রাণের জায়গা। ১৪২১ বঙ্গাব্দের ১ লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল, ইংরেজি ২০১৪) খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ মাওলানা মুহাম্মদ ফজলুর রহমানের উদ্দ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় আল হেরা পাঠাগার। প্রথমে পাঠাগারটি ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করে। ২০১৭ সালে থেকে আল হেরা পাঠাগারের বার্ষিক কাজের আওতায় বই পড়া উৎসব শুরু হয়। এই আয়োজনে গ্রামের শিশু কিশোর যুবক যুবতী সকল বয়সের মানুষই অংশগ্রহণ করে থাকেন। সম্প্রতি ভাটি বাংলার সর্বস্তরের মানুষদের নিয়ে আয়োজিত হয় ‘২য় বই পড়া উৎসব ২০১৮'। ২০ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ৬ দিন ব্যাপী এই আয়োজনের আহবায়ক ছিলেন মুহাম্মদ আজহারুল ইসলাম। এতে সমন্নয়কের দায়িত্ব পালন করেন কবি মাসুম মুনাওয়ার।
![]() |
| চকের মাধ্যমে বোর্ডে ব্যানার করেছেন মোবারক |
৬ দিন ব্যাপী এ উৎসবের প্রথম দিন ২০ আগস্ট সকাল ১০ টায় শুভেচ্ছা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন আল হেরা পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ফজলুর রহমান। সারা দিনব্যাপী বইপাঠ, বিতরণ ও প্রচারনার, মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠান শেষ হয়।
দ্বিতীয় দিন ২১ আগস্ট স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে মত বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে দিনটি শুরু হয়ে সারাদিন প্রচারণা ও বই বিতড়নের কাজ চলে। বিকেলে ছাত্র ও কৃষকদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারী সকলে পাঠাগারের নিয়মিত সদস্য হয়ে বই পড়ার শপথ গ্রহণ করেন। একটি উৎসব মুখর দিন পালিত হয়।
![]() |
| সমাপনী অনুষ্ঠানের অথিতিবৃন্দ |
তৃতীয় দিন ২২ অগাস্ট ঈদ উদযাপন ও কুশল বিনিময়ের আনন্দ চলে সারাটা দিন। পাঠাগারের নিয়মিত ও অনিয়মিত সকল সদস্যদের নিয়ে ঘোরাঘুরি ও সাধারণ মানুষের সাথে ভাব বিনিময় করে দিনটি পালিত হয়। উৎসবের অংশ হিসেবে স্থানীয় পেশাজীবীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পাঠাগারের সদস্যরা। এতে সকল পেশাজীবী মানুষ পাঠাগারের উন্নতি কামনা করেন।
![]() |
| উপস্থিত দর্শক শ্রোতা |
৪র্থ দিন ২৩ আগস্ট নারী শিক্ষার্থী ও গৃহিণীদের সাথে মত বিনিময় করা হয়। নারীদের সাথে বই পাঠের গুরুত্ব ও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষ উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া পাঠাগারের নিয়মিত সদস্যদের নিয়ে ‘বই পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও আমাদের করণীয়’ বিষয়ক পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়।
![]() |
| কথা বলছেন শিক্ষাবীদ বিমল চন্দ্র পাল |
২৪ আগস্ট ৫ম দিন স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান ও ইমামদের সাথে মত বিনিময় করা হয়। তাদের মধ্যে বই বিতরণ করা হয়। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বার পাঠাগারের সার্বিক উন্নতির জন্যে এর উত্তরোত্তর উন্নতি কামনা করেন। উনারা নিয়মিত বই পাঠের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এছাড়া বিভিন্ন গ্রামের স্কুল ছাত্রদের সাথে উন্মুক্ত আড্ডা দেয়া হয়।
![]() |
| অনুষ্ঠান শেষে ছবি তোলা পর্ব |
![]() |
| অনুষ্ঠান পরবর্তী ছবি |
৬ষ্ঠ দিন ২৫ অগাস্ট বই পড়া উৎসবের শেষ দিন সমাপনী অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় দুটো পর্বে। প্রথম পর্বে আলোচনা ও দ্বিতীয় পর্বে কবিতাপাঠ ও আবৃত্তি। জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। চলে মত বিনিময় ও আলোচনা পর্ব। এতে বিভিন্ন পেশার ও বয়সের নারী-পুরুষ অংশ নেন। আলোচনা পর্বে বই পাঠের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ন কথা বলেন সমাপনী অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কবি রইস মনরম, শিক্ষাবিদ বিমল চন্দ পাল, পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, রাম জীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ খাইরুল ইসলাম ও স্কুলের সভাপতি অনিক মিঞা। এছাড়া পাঠাগারের কার্যক্রম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক মুহাম্মদ আজহারুল ইসলাম, এনামুল হক খোকা, ঢকা থেকে আগত কবি ও শিল্পী আল নোমান, সৈয়দা মুমতাজ টুকু, এনামুল হক এনাম। প্রতিটি গ্রাম থেকে একজন করে প্রতিনিধি শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। এরা হলেন মাসুদ আহমেদ, স্মৃতি, শুভ, মোজাহিদ, রিয়েল।
![]() |
| দ্বিতীয় দিন কৃষক ও ছাত্রদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ |
কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি পর্বে কবিতা পাঠ করেন কবি রইস মনরম, কবি মোজাহিদ আনফর, কবি মাসুম মুনাওয়ার ও কবি রেদওয়ান আহম্মেদ হৃদয়। অনুষ্ঠানটি রাম জীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে অত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মাকসুদ জামিল। অনুষ্ঠানের শেষে সকলকে বিস্কৃট খাওয়ানো হয়।
![]() |
| কবিতা পাঠ করছেন কবি রইস মনরম |
আল হেরা পাঠাগার মূলত গ্রামের মানুষের মধ্যে পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই আয়োজনকে উৎসবের মত করে পালন করে। এতে সকলের অংশগ্রহণ তাদের চেষ্টাকে সফল করে তোলে। বর্তমানে এ পাঠাগারের বই সংখ্যা এক হাজারের থেকেও বেশি। আল-হেরা পরিবার মানসিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের জনমনে গড়ে তুলবে স্তস্থির সোপান, প্রতিটি মানুষের মনে জাগিয়ে তুলবে জ্ঞান বিকাশের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেম। যার রশ্মিতে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়বে সারাদেশসহ বিশ্বে। অদূর ভবিষ্যতে এটি হবে ভাটি বাংলার বিশাল জনসমাজের প্রিয় ও সমৃদ্ধ পাঠাগার। জনমনে উদয় হোক তার চঞ্চলতা। কাজ কর্মের পরিধি বেড়ে উঠুক, চালু হোক কর্ম তৎপরতা।
২য় বই পড়া উৎসবে কবি রইস মনরম(ডানে) আল-হেরা পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতার(মাঝখানে) কাছে তাঁর লেখা তৃতীয় কবিতার বই 'মেঘের কঙ্কাল' উপহার দিচ্ছেন। সাথে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বিমল চন্দ পাল (বাঁয়ে)।
![]() |
| অনুষ্ঠান পরবর্তী আড্ডা |










কোন মন্তব্য নেই